পরস্পরবিরোধী বড় বড় রাষ্ট্রশক্তিগুলোর সঙ্গে যুগপৎ সম্পর্ক রাখার একটি বিরল যোগ্যতা আছে পাকিস্তানের।
তাই এরা যেমন ট্রাম্পের প্রশংসা পায়, আবার ইরানেরও প্রশংসা পায়। চরম মার্কিন দাসত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান জুড়ে চীনের ব্যাপক ইনভেস্টমেন্ট আছে। রাশিয়া বা জাপানের সাথেও পাকিস্তানের সম্পর্ক খুবই গভীর।
মার্কিন প্ররোচনায় পার্শ্ববর্তী ভ্রাতৃপ্রতিম আফগানদের সাথে চরম অমানবিক আচরণ করে পাকিস্তান। অন্যদিকে, সেই পাকিস্তানই আবার সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো পরস্পর বৈরী শক্তিগুলোর সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও কাতারের সাথেও পাকিস্তানের গভীর সামরিক সম্পর্ক আছে।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট খুবই প্রবল। প্রশাসন ও পুলিশ অত্যন্ত অকার্যকর ও দুর্নীতিগ্রস্ত। এর মধ্যেও এই দেশটা কিভাবে বিশ্বের পরস্পরবিরোধী বড় বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে?
আসলে এটা বুঝতে হলে দৃষ্টি রাখতে হবে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মগত বৈশিষ্ট্যের দিকে। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল পলিটিক্যাল টেবিলে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন তুখোড় কৌশলী, যুক্তিবাদী এবং যেকোনো নেগোসিয়েশনে বিজয়ী হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি এই নেগোসিয়েশনেই ওস্তাদ। নেগোসিয়েশন হলো পাকিস্তানের statecraft tradition. এই রাষ্ট্রটির বিশেষত ডিপ্লোম্যাসি ও সামরিক স্ট্র্যাটেজি মূলত বহুমুখী শক্তির সাথে টেবিল নেগোসিয়েশন নির্ভর।
তাই পাকিস্তানের এই “সব দিকেই সম্পর্ক রাখা”র ক্ষমতাটা কাকতালীয় নয়। এটি বহু দশকের একটি সচেতন geopolitical survival strategy. রাষ্ট্রীয়ভাবে নেগোসিয়েশনে এক্সপার্ট হওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু কারণে পাকিস্তান একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে।
প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান। পাকিস্তান এমন একটি অঞ্চলে আছে যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের পশ্চিমাঞ্চল একসাথে যুক্ত হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরান, ভারত, আরব সাগর—সবকিছুর মাঝখানে অবস্থান হওয়ায় বড় শক্তিগুলো পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ হারাতে চায় না। এই অবস্থান পাকিস্তানকে একটি স্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব দেয়।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী-নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্রনীতি। পাকিস্তানে বেসামরিক সরকারগুলো দুর্বল হলেও সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পররাষ্ট্র ও সিকিউরিটি পলিসি চালায়। ফলে এসব নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকে। সেনাবাহিনী খুব বাস্তববাদীভাবে সম্পর্ক ব্যালেন্স করে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অন্যদিকে চীনের সাথে যুদ্ধ কৌশলগত জোট রক্ষা করে।
তৃতীয়ত, চীনের সাথে কৌশলগত সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব। চীন পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য হিসেবে দেখে। এজন্য CPEC-এর মতো বড় বিনিয়োগ করেছে। ফলে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও বেইজিং তাকে ছেড়ে দেয় না।
চতুর্থত, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সামরিক নেটওয়ার্ক। সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, জর্ডান, তুরস্ক—এই দেশগুলোতে বহু পাকিস্তানি সামরিক প্রশিক্ষক কাজ করেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ উৎস। তাই এসব দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
পঞ্চমত, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত আবশ্যকতা। ১৯৮০ এর দশকের আফগান যুদ্ধের সময় থেকেই পাকিস্তান আমেরিকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও গোয়েন্দা অংশীদার। সম্পর্ক কখনো খারাপ হলেও পুরোপুরি ভেঙে যায় না, কারণ ওয়াশিংটনেরও কিছু অনিবার্য কৌশলগত প্রয়োজন আছে।
পাকিস্তানের এ ধরনের টেকনিককে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে "কৌশলগত দ্বৈততা" (Hedging) বলে। এই Hedging কৌশল প্রয়োগ করে পাকিস্তান সচেতনভাবে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে। এতে কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হয় না।
তবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এসেট যেমন তার জন্মগত নেগোসিয়েশন স্কিল, তেমনি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার জন্মগত আইডিওলজিক্যাল গোঁজামিল। জন্মের সময় থেকেই পাকিস্তান ইসলামী আদর্শ ও পশ্চিমা পুঁজিতন্ত্রের মধ্যে ব্যালেন্স রক্ষা করতে চেয়েছে এবং এতেই বারবার হোঁচট খেয়েছে। দেশের মধ্যকার বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামভিত্তিক বন্ধনকে অটুট করতে পারেনি। পরাশক্তি হওয়ার সব ধরনের পোটেনশিয়াল থাকা সত্ত্বেও মতাদর্শিক দৃঢ়তার অভাবে দেশটি এখনো একটি দুর্বল অর্থনীতি ও অনুন্নত সুযোগ-সুবিধার রাষ্ট্র হিসেবে স্ট্রাগল করছে।